শনিবার, ১৫ মে ২০২১, ০৮:০৮ পূর্বাহ্ন

বিজ্ঞপ্তিঃ
দিনাজপুর থেকে প্রকাশিত সরকারি মিডিয়া তালিকাভুক্ত দৈনিক খবর একদিন পএিকার জন্য খানসামা, হাকিমপুর, ঘোড়াঘাট ও চিরিরবন্দরের জন্য উপজেলা প্রতিনিধি আবশ্যক। মেইল : khaborekdin2012@gmail.com। মোবাইল : 01714910779
সর্বশেষঃ
দিনাজপুর শহরসহ জেলার ১৩টি উপজেলার প্রায় ৭ হাজার মসজিদে ঈদুল ফিতরের নামাজের জামায়াত অনুষ্ঠিত ফুলবাড়ীতে ঝড়ে উড়ে গেল প্রধান মন্ত্রীর উপহারের ঘরের চাল ফুলবাড়ীতে সড়ক দূর্ঘটনায় চালকসহ আহত ১০ যাত্রী ফুলবাড়ীতে আনসারদের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ বীরগঞ্জে বজ্রপাতে এক নারী নিহত দিনাজপুরে সেন্ট ফিলিপস্ এলামনাই ফোরাম এর উদ্যোগে ঈদ উপহার প্রদান পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির শুভেচ্ছা দিনাজপুরে বিভিন্ন আয়োজনে আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস পালিত ত্যাগের মধ্যে যে আনন্দ আছে ভোগের মধ্যে তা নেই-হুইপ ইকবালুর রহিম বাংলাদেশের উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করা স্বাধীনতা বিরোধীদের অপপ্রয়াস- এমপি গোপাল

করোনাকালে সচল পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া পাথর খনি

বৈশ্বিক মহামারী করোনায় যখন একের পর এক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বেকার হচ্ছে লক্ষ লক্ষ কর্মক্ষম মানুষ। তখন ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে মধ্যপাড়া পাথর খনি।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দেশের একমাত্র দিনাজপুরের পার্বতীপুরে মধ্যপাড়া পাথর খনিটিতে রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদনের পাশাপাশি বিক্রিও বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে।
করোনায় স্বাস্থ্য বিধি মেনে দেশের অর্থনীতির চাকা খনির উন্নয়ন ও উৎপাদন সমান তালে সচল রেখেছে খনির ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জার্মানীয়া-ট্রেষ্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)। জিটিসি দায়িত্ব গ্রহনের পর দুইবার লাভের মুখ দেখলো। করোনা পরিস্থিতিতেও মাত্র সাড়ে ৩ মাসে পাথর উত্তোলন হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টন পাথর। শুধুমাত্র গত এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৭ মাসে মহামারী করোনাকালিন সময়ে ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০ টন পাথর বিক্রি করে রাজস্ব আয় হয়েছে ২২৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। খনির ইয়ার্ডে বর্তমানে পাথর মজুদ আছে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন পাথর। প্রতিদিন খনি থেকে পাথর বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার মে.টন। প্রতিমাসে পাথর উৎপাদন হচ্ছে ১ লাখ ২৫ হাজার মে.টন।

খনি সুত্রে জানা গেছে, করোনায় ৩ মাস বন্ধ থাকার পরও ২০১৯-২০ অর্থবছরে খনি থেকে ৮ লাখ ২৩ হাজার ৯৫৯ মে.টন পাথর উৎপাদন করা হয়। বিক্রি হয়েছে ৮ লাখ ৬৪ হাজার ৯০৬.৫২ মে.টন। এ থেকে প্রায় ২১ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৬৪৬ মে.টন। এর মধ্যে ৭ লাখ ৩১ হাজার ৪৯৩ টন পাথর বিক্রি করে ৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছে। করোনাকালিন সময়ে গত এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৭ মাসে ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০ টন পাথর বিক্রি করে রাজস্ব আয় হয়েছে ২২৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
জিটিসি’র সাথে চুক্তি অনুযায়ী খনির উন্নয়ন ও উৎপাদন সহায়ক সব ধরনের যন্ত্রাংশ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করবে খনি কর্তৃপক্ষ।

খনি কর্তৃপক্ষ সময়মত খনির অতি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও খনির উন্নয়ন ডিজাইন সরবরাহ করতে না পারায় ২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৭ সাল ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ বছর পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকে। ফলে মাইনিং যন্ত্রপাতির কারনে তিন শিফটে উৎপাদন শুরুর দেড় বছরের মাথায় ২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পাথর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। করোনায় গত ১৩ আগষ্ট থেকে পাথর উত্তোলন করে নভেম্বর পর্যন্ত জিটিসি প্রায় ৩ লক্ষ ৬০ হাজার মে. টন। দেশের একমাত্র মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে ২০০৭ সালের ২৫ মে। প্রথম অবস্থায় খনি থেকে দৈনিক ১ হাজার ৫শ’ থেকে ১ হাজার ৮শ’ টন পাথর উত্তোলন হলেও পরে তা নেমে আসে মাত্র ৫শ’ টনে। এর ফলে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত ৬ বছরে খনিটি লোকসান দেয় প্রায় একশ কোটি টাকা। এতে খনিটি ২০০৭ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রায় ২শ’ কোটি টাকা লোকসান করে।

এমন অবস্থায় খনির উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় বেলারুশের জেএসসি ট্রেস্ট সকটোস্ট্রয় ও দেশীয় প্রতিষ্টান জার্মানিয়া করপোরেশন লিমিটেড নিয়ে গঠিত জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামকে (জিটিসি)। জিটিসি’র সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর। চুক্তি অনুযায়ী তারা ৬ বছরে ১৭১.৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ৯২ লাখ মে.টন পাথর উত্তোলন করে দিবে। চুক্তি কার্যকর হয় ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী, উৎপাদন শুরু করে ২৪ ফেব্রুয়ারী। এরই মধ্যে জিটিসির সাথে চুক্তি মেয়াদ শেষ হয়ে যায় চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারী। এ সময়ের মধ্যে জিটিসি পাথর উত্তোলন করে প্রায় ৩৭ লক্ষ মেট্রিক টন। ২০২১ সালের ১৭ জুলাই জিটিসি’র চুক্তি মেয়াদ শেষ হবে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী ১ বছরে জিটিসি ১.১ মিলিয়ন মে.টন পাথর উৎপাদনের পাশাপাশি খনি ভূগর্ভে দু’টি স্টোপ উন্নয়ন করবে।

জিটিসি’র মতে প্রয়োজনীয় মাইনিং ইক্যুইবমেন্ট এবং এক্সপ্লোসিভের (বিস্ফোরক) অভাবে তারা ৩ বছর খনিটি পরিচালনা করতে পারেনি। এ জন্য মধ্যপাড়া খনি কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে জিটিসি ৩ বছর সময় এবং যন্ত্রাংশ ক্রয় বাবদ ৩০৩ কোটি টাকা দাবি করে। বিষয়টি এক পর্যায়ে আরবিটেশন ট্রাইবুনাল পর্যন্ত গড়ায়। আরবিটেশন ট্রাইবুনাল স্থিতিয়াবস্থা দিলে তা জিটিসি’র পক্ষে যায়। উভয়পক্ষের এই অচলাবস্থার মধ্যে ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানী লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবিএম কামরুজ্জামান হিসেবে যোগদান করে জিটিসি’র সাথে বিরোধ নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

সুত্র জানায়, দেশীয় একমাত্র মাইনিং কোম্পানী জামার্নীয়া কপোর্রেশন লিমিটেড ও বেলারুশ কোম্পানী ট্রেস্ট এস এস এর যৌথ প্রতিষ্ঠান জামার্নীয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) এ করোনাকালেও খনির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী পরিমান পাথর উত্তোলন করে মধ্যপাড়া পাথর খনির উৎপাদন ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে। বেলারুশিয়ান খনি বিশেষজ্ঞ এবং দেশী প্রকৌশলীসহ প্রায় সাড়ে ৭শ’ দক্ষ খনি শ্রমিক ৩ শিফটে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করছে। এদিকে, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসি’র চুক্তি মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় খনি কর্তৃপক্ষ নতুন ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র আহবান করে ফেব্রুয়ারী মাসে। করোনার কারণে দরপত্র দাখিলের সময় কয়েক দফা বাড়িয়ে তা চলতি বছরের ২০ ডিসেম্বর করা হয়। নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হলে খনির পাথর উৎপাদনের বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখা যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। উৎপাদন কমে গেলে ফের খনিটি লোকসানের মুখে পড়ার শংকার কথা জানান- হরিরামপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি সাহাবুদ্দিন শাহসহ খনি সংশ্লিষ্ট ও এলাকাবাসী।

এ অবস্থায় তারা জিটিসি’র সাথে চুক্তি নবায়নের আহবান জানান। মধ্যপাড়া খনি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাদিকুল ইসলাম জানান- জিটিসি এই পাথর খনিতে রেকর্ড পরিমানে পাথর উত্তোলন করায় পাথর বিক্রি বেড়েছে। বদলে গেছে খনি এলাকার অর্থনীতির চেহারা। আর তাই লোকসানি পাথর খনিটি আজ লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে। মধ্যপাড়া মহাবিদ্যালয় অধ্যক্ষ ওবায়দুর রহমান জানান, জিটিসিকে আবার এই পাথর খনির দায়িত্ব দিলে পাথর উত্তোলনের রেকর্ড অব্যাহত থাকবে এবং খনিটির লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ধারা অব্যাহত থাকবে এবং খনিটি আর লোকসানী হয়ে অর্থনীতির বোঝা হবেনা বলে এলাকার সচেতন মহল মনে করেন।

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানী লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবিএম কামরুজ্জামান বলেন, বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণ বিস্তারের ফলে অন্য কোন উৎস থেকে উন্নতমানের পাথর সরবরাহ না পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন সরকারি মেগা প্রকল্পের পাথরের চাহিদা পূরনের জন্য এ খনির বিশ্বমানের পাথর নেয়ার জন্য সকল প্রতিষ্ঠান আগ্রহী হয়ে ওঠে। এছাড়াও মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহারে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের উদ্যোগে সাড়া দিয়ে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতু, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বঙ্গবন্ধু সেতুর রেলসংযোগ নির্মাণ প্রকল্প, রেলপথ ও সড়ক সেতু মন্ত্রনালয়সহ বহু সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের নির্মাণ কাজে মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার করেছে। এ জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসিকে ধন্যবাদ জানান। এ ঘটনা মধ্যপাড়ার পাথরের চাহিদা ও বিক্রি বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন