শনিবার, ১৫ মে ২০২১, ০৮:০৪ পূর্বাহ্ন

বিজ্ঞপ্তিঃ
দিনাজপুর থেকে প্রকাশিত সরকারি মিডিয়া তালিকাভুক্ত দৈনিক খবর একদিন পএিকার জন্য খানসামা, হাকিমপুর, ঘোড়াঘাট ও চিরিরবন্দরের জন্য উপজেলা প্রতিনিধি আবশ্যক। মেইল : khaborekdin2012@gmail.com। মোবাইল : 01714910779
সর্বশেষঃ
দিনাজপুর শহরসহ জেলার ১৩টি উপজেলার প্রায় ৭ হাজার মসজিদে ঈদুল ফিতরের নামাজের জামায়াত অনুষ্ঠিত ফুলবাড়ীতে ঝড়ে উড়ে গেল প্রধান মন্ত্রীর উপহারের ঘরের চাল ফুলবাড়ীতে সড়ক দূর্ঘটনায় চালকসহ আহত ১০ যাত্রী ফুলবাড়ীতে আনসারদের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ বীরগঞ্জে বজ্রপাতে এক নারী নিহত দিনাজপুরে সেন্ট ফিলিপস্ এলামনাই ফোরাম এর উদ্যোগে ঈদ উপহার প্রদান পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির শুভেচ্ছা দিনাজপুরে বিভিন্ন আয়োজনে আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস পালিত ত্যাগের মধ্যে যে আনন্দ আছে ভোগের মধ্যে তা নেই-হুইপ ইকবালুর রহিম বাংলাদেশের উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করা স্বাধীনতা বিরোধীদের অপপ্রয়াস- এমপি গোপাল

চেনা মুখ অচেনা মানুষ : ঢাকা প্রবাসী জগলুল পাশার দিনাজপুর ভাবনা

আজহারুল আজাদ জুয়েল:-

দিনাজপুরে পরিচিতি ‘কেমব্রিজ’ নামে। ঢাকায় ‘জগলুল পাশা’। পুরো নাম আবু জাহিদ মোঃ জগলুল পাশা কেমব্রিজ। ঢাকার মোহাম্মদপুর সেন্ট্রাল কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ তিনি। বর্তমানে ঐ কলেজেরই ম্যানেজমেন্ট বিভাগীয় প্রধান ও এসোসিয়েট প্রফেসর। একজন গুণী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত, সেই সাথে পাঠ্য বইয়ের লেখক ও কলামিষ্ট।
জগলুল পাশা দিনাজপুর জেলা শহরের বালুবাড়ির সন্তান। বাবা মোঃ নুরুল ইসলাম চৌধুরী দিনাজপুর জেলা জজ কোর্টের সেরেস্তাদার ছিলেন, বদরগঞ্জের একটি জমিদার পরিবারের সন্তান। মা বেগম শামসুন নাহার ইসলাম চৌধুরীও নবাবগঞ্জের একটি জমিদার পরিবারের উত্তরসুরি। লেখাপড়ার সূত্রে ঢাকায় যাওয়ার পর ঢাকাতেই স্থায়ী হয়েছেন জগলুল পাশা। তার প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাজীবন কেটেছে বালুবাড়ির নির্মল শিশু বিদ্যালয়ে। দিনাজপুর জিলা স্কুলে কেটেছে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা জীবন। ১৯৮০ সালে এসএসসি পাশ করেছেন। ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে এইচএসসি পাশ করেছেন ১৯৮২ সালে। এরপর ঢাকা ইউনিভার্সিটি হতে ম্যানেজমেন্টের উপর বি.কম এবং এম.কম অনার্স সম্পন্ন করেছেন।
সরাসরি কোন রাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত ছিলেন না কখনো। তবে ছাত্র জীবনে প্রগতিশীল ভাবনায় সমাজতান্ত্রিক চেতনা লালন করতেন মনের ভিতরে। রাজনৈতিক সচেতনতায় সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের নিক্ষিপ্ত ককটেলে অজ¯্র ছাত্র-ছাত্রীর সাথে গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি নিজেও। রউফুন বসুনিয়া হত্যার পরদিন প্রতিবাদী বিক্ষোভের জহুরুল হক হল ও মহসীন হলের মাঝামাঝি স্থানে ককটেলের স্প্রিন্টার বিদ্ধ হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছিলেন।
জগলুল পাশা ওরফে কেমব্রিজ শিক্ষা জীবন শেষে ব্যবসার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরে শিক্ষকতায় আসেন। ১৯৯০ সালে ঢাকা সিটি কলেজে তার শিক্ষকতার শুরু। ১৯৯৭ সালে যোগ দেন ঢাকার মোহাম্মদপুর সেন্ট্রাল কলেজে। এই কলেজের পরিচালনা পরিষদে শিক্ষক প্রতিনিধি ও ষ্টাফ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন তিনি। ২০১১ সাল হতে প্রায় সাড়ে ৪ বছর উপাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
পেশার বাইরে সৃজনশীল কর্মকান্ডে যুক্ত আছেন দিনাজপুরের সন্তান জগলুল পাশা। দৈনিক জনকন্ঠসহ বিভিন্ন পত্রিকায় তার লেখা অসংখ্য কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। একজন কলামিষ্ট হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছেন। আজকের কাগজ ও জনকন্ঠ সহ বাংলাদেশের বহু পত্রিকায় তার কলাম প্রকাশিত হয়েছে। তিনি লেখক হিসেবে হিসেবে ‘জগলুল পাশা’ নাম ব্যবহার করে থাকেন। ইংলিশ ভার্সনে আন্ডার গ্রাজুয়েশন ও পোষ্ট গ্রাজুয়েশন লেবেলে যৌথভাবে লেখা ১২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার। এইসব বই বিবিএ, এমবিএ’র ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠ্যবই হিসেবেও ব্যবহত হচ্ছে। তবে এইসব বইয়ে তার পুর্ণাঙ্গ নামই মুদ্রিত হয়েছে
জগলুল পাশা ঢাকায় আছেন ৪০ বছর ধরে। শিক্ষকতার সাথে নিজের আলাদা ভূবন গড়ে তুলেছেন। যদিও ঢাকায় থাকেন তবুও দিনাজপুরের ভাবনায় মন আচ্ছন্ন থাকে। তার লেখার বড় অংশ জুড়ে থাকে দিনাজপুরের উন্নয়ন ভাবনা। কি ভাবেন তিনি? কি মনে করেন দিনাজপুর সম্পর্কে?
জগলুল পাশা মনে করেন, স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর অতিক্রান্ত হলেও দিনাজপুরের কাংখিত উন্নয়ন হয় নাই এবং এখনো হচ্ছে না। তিনি পর্যটনের বিকাশকে উন্নয়নের একটি বড় মাধ্যম বলে মনে করেন। তাই দিনাজপুরের রাজবাড়ী, কান্তজীর মন্দির, গীরিজা ক্যানেল, ঘাগড়া ক্যানেল, রামসাগর, আনন্দ সাগর, মাতা সাগর, জুলুম সাগর, কড়াই বিল, আশুরার বিলকে কেন্দ্র করে যে পর্যটন এলাকা গড়ে উঠতে পারে, তা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লিখেছেন।
তার ধারণা, পার্বতীপুর রেলওয়ে কারখানার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারন করে রেলের ইঞ্জিন, ওয়াগন, বগি তৈরী ও মেরামত করলে এবং অটোমোবইল ও ভেহিকল ইন্ডাষ্ট্রিজ এর ব্যাপক উন্নয়ন-সম্প্রসারণ করা হলে দিনাজপুরের বেকারত্ব হ্রাস পাবে। কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতি হওয়ার কারণে দিনাজপুর জেলায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি। মহারাজা স্কুলের রাজকীয় ভবনটি ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি ভয়াবহ বিস্ফোরণে ধ্বংস হওয়ার পর নতুন যে ভবন করা হয়েছে তা মোটেও ঐ স্কুলের উপযোগী নয় বলে তিনি মনে করেন। তার মতে ১৯৭২ সালের ৬ই জানুয়ারি ভয়াবহ বিস্ফোরণে যারা শহীদ হয়েছেন তারা সবাই ছিলেন এ দেশের সূর্য সৈনিক। সূর্য সৈনিকদের আত্মবিসর্জনের প্রতি সম্মান দেখাতে হলে মহারাজা স্কুল প্রাঙ্গণে পুরনো রাজকীয় ভবনের আদলে একটি নতুন ভবন প্রতিষ্ঠা করা উচিৎ এবং সেই রাজকীয় ভবনে ক্যাডেট কলেজ স্থাপন করা উচিৎ।
তিনি আরো মনে করেন যে, ফুলবাড়ি-নবাবগঞ্জসহ অত্রাঞ্চলে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও সারখানা স্থাপন করা দরকার। বাংলাবান্ধা, হিলি, বিরল স্থলবন্দরে পোর্ট হ্যান্ডেলিং, ফর্কলিফট, হোটেল, মোটেল, রেষ্টুরেন্ট ও দক্ষ ক্লিয়ারিং হাউজের ব্যবস্থা করা দরর্কা। তিস্তা নদীকে ভিত্তি ধরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত নদীবন্দর প্রতিষ্ঠা করলে দিনাজপুরসহ রংপুর বিভাগের উৎপাদিত পণ্য ফিডার জাহাজের মাধ্যমে সামুদ্রিক বন্দরগুলোতে নিয়ে গিয়ে রপ্তানীর ব্যবস্থা করা সম্ভব। জেলা ভিত্তিক সুষম বাজেট নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনীতির সাথে আমি যুক্ত নই। কিন্তু অবহেলিত দিনাজপুর-রংপুরের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য চিন্তা করি, মানুষকে জাগানোর চেষ্টা করি, সরকারকে বার্তা দিতে সচেষ্ট থাকি।
জগলুল পাশা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় বলে মনে করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। তার পরেও তার মনে আছে যে, বাঙালিরা বালুবাড়ি এলাকায় কিভাবে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প (বর্তমান পল্লীশ্রী ভবন) দখল করেছিল, অবরুদ্ধ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের ক্যাম্পের পেছন দিক দিয়ে কিভাবে পালিয়ে যেতে সহায়তা করা হয়েছিল, কিভাবে বাবা-মা, ভাই-বোনদের সাথে দিনাজপুর শহর ছেড়ে নবাবগঞ্জ উপজেলার কোটগ্রামে উপস্থিত হয়েছিলেন, সেখানে নানা শরফুদ্দীন চৌধুরীর বাড়িতে পালিয়ে থেকেছিলেন কিভাবে, আর কিভাবে হিলির যুদ্ধে বিমান, ট্যাংক, কামান ছোটাছুটি করছিল তার সবই মনে করতে পারেন তিনি।
জগলুল পাশার ৪ ভাই ৩ বোন। ভাইদের মধ্যে শুধু এক ভাই দিনাজপুরে থাকেন। নাম সারোয়ার হাসান ক্লিপ্টন। তিনি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর সাথে যুক্ত এবং পামেলা কুসুম নামের তেলের উৎপাদক ও বিক্রেতা। অন্য ভাই চৌধুরী রাফাত পাশা প্লুটো কানাডা প্রবাসী। আরেকজন মাসুদ পাহলবী জুরিখ ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের হাইড্রোজুওলজিষ্ট হিসেবে ঢাকায় কর্মরত। বোনেরা সবাই ঢাকা প্রবাসী। সবচেয়ে বড় বোন সেলিমা আখতার ঢাকার আল এহসান স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, বর্তমানে অবসরে।
জগলুল পাশা কৈশোরকালে ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেটে আসক্ত ছিলেন। ১৯৯৪ সালে দিনাজপুর শহরের বালুয়াডাঙ্গা নিবাসী ইমদাদুল হকের কন্যা বর্তমানে সরকারি চাকুরিতে কর্মরত ডা. ইয়াসমিন হকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ঢাকার প্রবাস জীবনে স্থায়ী হয়েও দিনাজপুরকে নিয়ে কেন এত ভাবনা? আমার এমন প্রশ্নের উত্তরে মোহাম্মদপুর সেন্ট্রাল কলেজের অধ্যাপক, কবি ও কলামিষ্ট জগলুল পাশা বলেন, যে মাটিতে জন্ম নিলাম, খেলাম ও মানুষ হলাম সেটা আমার অরিজিন। তাই সেটা নিয়ে না ভাবতে তো হবেই।

লেখক:
আজহারুল আজাদ জুয়েল,
সাংবাদিক, কলামিষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন