1. admin@dailykhaborekdin.com : দৈনিক খবর একদিন :
  2. khaborekdin2012@gmail.com : Khabor Ekdin : Khabor Ekdin
বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ০৬:৪৬ পূর্বাহ্ন
বিজ্ঞপ্তিঃ
দেবীগঞ্জে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সমাবেশ বিনোদনগর ইউনিয়নে দিনাজপুর জেলা তথ্য অফিসের দিনব্যাপী ওরিয়েন্টেশন কর্মশালা Jahed Ul Islam is the name of inspiration for the young generation MD Mizanur Rahman Mia is a talented young Bangladeshi singer, Digital Marketer and musical artist. ফুলবাড়ীতে মাস্টার্স পরিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার ৭নং বিজোড়া ইউপি চেয়ারম্যান পদে মো : এরশাদুজ্জামান মোল্লা’র মনোনয়ন দাখিল দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসাতালের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস পালিত দেবীগঞ্জে জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট এর শুভ উদ্বোধন কর্মস্থলে যোগদান ও বকেয়া বেতনের দাবীতে টানা এক মাস ব্যাপী বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত। তেঁতুলিয়ায় চা পাতার ন্যায্যমূল্যের দাবিতে চা চাষীদের মানববন্ধন

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মাহিজান বেওয়া

দৈ‌নিক খবর একদিন ডেস্ক
  • সর্বশেষ সংবাদ শুক্রবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৬২৪ বার প‌ঠিত

আজহারুল আজাদ জুয়েল: প্রায় ৭০-৭২ বছরের বৃদ্ধা ছিলেন মাহিজান। বিধবা। ৩ পুত্র ৩ কন্যা সন্তানের জননী। পুত্রদের নাম মো: হাসেম, আব্দুল মান্নান, আব্দুল কাদির। কন্যাদের নাম রাবেয়া খাতুন, ফাতেমা বেগম, মঞ্জুয়ারা। ৬ সন্তানের সকলের বৈবাহিক জীবন ও আলাদা সংসার শুরু হয়েছিল। তবে সবাই এক সাথে থাকতেন। পুত্রদের মধ্যে মো: হাসেম দিনাজপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সরকারি চাকুরীজীবী ছিলেন। আব্দুল মানান্ন সরকারি পানি উন্নয়ন বোর্ডে চাকুরীজীবী হিসেবে পাবনার হেমায়েতপুরে অবস্থান করছিলেন। ১৭ এপ্রিল মুজিব নগর সরকার গঠন হলে আব্দুল কাদির ঐ সরকারের চাকুরী করতেন।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে দিনাজপুর জেলার সার্বিক পরিস্থিতি খারাপ হলে মো. হাসেম নিরাপত্তার স্বার্থে ২৬-২৭ মার্চ এর দিকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে মাঝাডাঙ্গায় সরে যান। কুঠিবাড়ি দখলের মাধ্যমে ২৮ মার্চ দিনাজপুর শহর বাঙালির দখলে চলে এলে তিনি সবাইকে নিয়ে আবারো বাসায় ফিরে আসেন। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা ১৪ এপ্রিল আবারো দিনাজপুর দখল করলে মাহিজানের তিন পুত্রের পরিবারের সবাই আবারো মাঝাডাঙ্গা-ফরক্কাবাদ হয়ে মঙ্গলপুরে যান এবং সেখানকার মজিবর মেম্বারের বাড়িতে এক রাত কাটান। পরদিন যান বিরলের সেনগ্রামে। পরে বোচাগঞ্জের বেলবাঁশে ও মুটুকপুরে অবস্থান করেন।

নিজের বাড়ির পাশে এই কবরে শুয়ে আছেন ১৯৭১ সালে শহীদ মাহিজান বেওয়া

নুরুননবী রবি, পিতা-আব্দুল মান্নানের কাছ থেকে জানা যায়, সেনগ্রামে যাওয়ার সপ্তাহখানেক না যেতেই মাহিজান বেওয়া বাড়ি ফেরার জন্য অস্থির হয়ে উঠেন। ‘ মুই থাকিম নাই। বাড়ি যাম। মোর গরু আছে। মোর নেংরি আছে। মোর হাঁস-মুরগীলা আছে। এইলাক কে খিলাবে? মুই থাকিম নাই। মুই বুড়া মানুষ। মোর কিছু হবে নাই।’ এইসব কথা বলে পরিবারের সবাইকে অস্থির করে তোলেন।
মাহিজানের একটি গরুর নাম ছিল। ‘নেংরি’ ডাক দিলেই গরুটি তাঁর কাছে ছুটে আসত। তিনি বার বার গরুটির কথা বলতে থাকেন, আর বাড়িতে পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত আবেদুল নামের এক ব্যক্তির সাথে মাহিজান বেওয়াকে দিনাজপুর শহরে পাঠানো হয়। পাটুয়াপাড়ায় ফিরে নিজ বাড়িতে অবস্থান করেন।
তাঁর খাওয়া-খাদ্যের কোন সমস্যা ছিল না। নিজে রান্না করতে পারতেন। বড় পুত্র হাসেম সরকারি চাকুরজীবী হিসেবে মাঝে মাঝে শহরে এসে মায়ের সাথে দেখা করে খোঁজ-খবর নিতেন। জুন-জুলাইয়ের দিকে একদিন বাড়িতে গিয়ে দরজায় নক করলে কেউ দরজা খুলছিল না। ব্যাপার কি? তিনি প্রাচীর টপকে বাড়ির ভিতরে গিয়ে দেখেন যে, তার মা মাহিজান বেওয়া আঙ্গিনায় লাশ হয়ে পড়ে আছে। মাথায় আঘাতের চিহ্ন। রক্তপাতও হয়েছে।
শহীদের নাতি ও সাংস্কৃতিক কর্মী নূরুল মতিন সৈকতের তথ্য থেকে জানা যায়, মাহিজানের বড় পুত্র মোঃ হাসেম ডিসি অফিসের নাজির ছিলেন। তিনি বাড়িতে এসে উঠানে মায়ের লাশ পড়ে থাকতে দেখে রামনগরে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পের ক্যাপ্টেনের সাথে দেখা করেন ও লাশ দাফনের জন্য ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানান। তারা ডিসি অফিসে যোগাযোগ করতে বললে তিনি ডিসি অফিসে যোগাযোগ করেন। এরপর পাকিস্তানি মেজর কামরুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ হলে মেজর কামরুজ্জামান বলেছিলেন, ইয়ে বুদ্ধা হামারি মা কি সমান হ্যায়। তিনি ডিসি অফিসের নাজিরের অনুরোধে কাফন-দাফনের জানাজার ব্যবস্থা করেন। জানাজা শেষে বাড়ির সামনে পারিবারিক কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।
মাহিজানকে কারা মেরেছে তা আজও জানা যায় নাই। তবে ধারণা করা হয় যে, বিহারি ও স্থানীয় লুটেরাদের হাতে তিনি মারা গেছিলেন। হয়ত লুটপাটে বাধা দেয়ার চেষ্টা করায় মাথায় আঘাত দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, মাহিজানের দ্বিতীয় পুত্র পুত্র আব্দুল মান্নান ছিলেন দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান মহসীন আলীর ভগ্নীপতি। তৃতীয় পুত্র আব্দুল কাদির ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও দিনাজপুর সরকারি কলেজের ডেমোনেষ্ট্রেটর। তিনি একাত্তরে বিরামপুর দিয়ে ভারতে যান এবং মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাস মন্ত্রনালয়ে নিয়োগ পান। শহীদ মাহিজানের নাতি-নাতনীর সংখ্যা অনেক হলেও নারী নেত্রী ড. মারুফা বেগম ও ক্রাইম রিপোর্টার লিটন হায়দার বাংলাদেশে বিশেষ পরিচিত মুখ।
দাদী মাহিজান শহীদ হয়েছিলেন, আর নাতি নূরুন্নবী রবি পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তিনি নির্যাতিত হয়েছিলেন তিন দফা। একবার বিরল উপজেলার ফুলবাড়ী হাট এলাকায়. আরেকবার দিনাজপুর শহরের সোনালী ব্যাংকের পাশে, আরেকবার জিলা স্কুলের সামনে। অক্টোবরের শেষের দিকে দিনাজপুর জিলা স্কুলের সামনে তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে তার সাইকেল কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে তিনি সেখান থেকে পালাতে পেরেছিলেন।
নূরুন্নবী রবি’র বর্ণনা থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একবার তিনি নিমতলাস্থ সোনালী ব্যাংকের সামনে গেলে একজন পাকিস্তানি সেনা তার কাছ থেকে কলম চায়। তিনি কালো কালির কলম দিলে সৈনিকটি বলে ইয়ে নেহি। এরপর লাল কালির কলম দিয়ে তিনি বলেন, ইয়ে লাল কালি, ইয়ে কালা কালি। ‘কালি’ শব্দটা শুনেই খান সেনা ক্ষেপে গিয়ে তাকে বুট ও রাইফেলের বাট দিয়ে মারতে মারতে বলতে থাকে, শালে মালাউন হ্যায়, শালে কালি বলতে হ্যায়। সেই সময় করম আলী নামের এক পিওন এসে তাকে উদ্ধার করেন। লাল কালি ও কালো কালি বলতে এই দেশে কি বুঝানো হয় তিনি তা বুঝিয়ে দিলে হানাদার সৈনিক শান্ত হয়।
অপর নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটে দিনাজপুর রেল ষ্টেশনের কাছে নিউ হোটেলের সামনের একটি হোটেলে। নূরুন্নবী রবি জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার লক্ষে পাকিস্তান সরকার লোকজনকে তাদের বাসা-বাড়িতে ফিরানোর চেষ্টা করছিল। বাড়িতে ফেরা যায় কি না এটা বোঝার জন্য নভেম্বরের প্রথমার্ধে তিনি তার মানু মামা ও মামাার শ্যালকসহ আরো দু-একজনকে সঙ্গে নিয়ে বোচাগঞ্জের বেলবাঁশ হতে শহরে আসেন। শহরে এসে নিউ হোটেলের সামনের একটি হোটেলে খেতে বসেন। খাওয়া শুরু হওয়ার পর তার সঙ্গের একজন বলে ‘ঝোল’ দিজিয়ে। ঝোল শব্দ শনেই বিহারিরা বুঝে ফেলে যে, এরা বাঙালি। বিহারিরা তাদের টাকা-পয়সা কেড়ে নিয়ে হোটেল থেকে বের করে দেয়।
ঘটনা প্রসঙ্গে নূরুন্নবী রবি বলেন, আমরা উর্দুতে কথা বলে খেতে বসেছিলাম। ঝোল শব্দেই তারা বুজতে পারে যে, আমরা বাঙালি। তারা বাঙালি বোঝার পরেই থালা কেড়ে নেয়। হাত ধুইতে দেয় নাই। ১৪৩ টাকা ছিল সেটাও কেড়ে নিয়ে বের করে দেয়।’ এরপর বাড়ি এসে এক ঝলক বাড়িটি দেখে নিয়ে আবারো বেলবাঁশের দিকে রওনা দেই।
বেলবাঁশ থেকে পায়ে হেঁটে শহরে এসেছিলেন। পায়ে হেঁটেই বেলবাঁশে ফিরেন। ফেরার পথে ধুকুরঝারি-ঢেরাপাটিয়া পার হয়ে ফুলবাড়ি পর্যন্ত যেতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।সেখানে খান সেনাদের ক্যাম্প ছিল। ক্যাম্পের সেনারা তাদেরকে হল্ট ও ফলিন করায়। মারডাং দেয়। তারপর বলে, মুক্তি মারনেসে হামারে বদনাম হোতা হ্যায়। তুমলোক ইধারসে যাও।
এই কথা বলে তাদেরকে বিল দিয়ে যেতে বলা হয়। তখন শীতকাল ছিল। এমন শীতৈ ঠান্ডা পানি ভেঙ্গে তাদেরকে বেলবাশে যেতে দেয়া হয়। এভাবে হয়ত আরো অনেকে নির্যাতিত হয়েছে এবং নির্যাতিতদের অনেক দাদী-নানী হয়ত শহীদ হয়েছে, কিন্তু তাদের ক’জনের কবর আমরা জানি? -লেখক সাংবাদিক, কলামিষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

আজহারুল আজাদ জুয়েল,
সাংবাদিক, কলামিষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

সকল সংবাদ
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )
%d bloggers like this: